দেশীয় বাজারে নিত্যপণ্যের দাম অধিক হারে বাড়ছে। আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের বৃদ্ধিকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করালেও এর পুরোপুরি সত্যতা মিলছে না।
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কতিপয় পণ্য গত এক বছরে যে হারে বেড়েছে, সে তুলনায় দেশীয় বাজারে বেড়েছে অনেক বেশি হারে। পণ্যগুলো হচ্ছে চাল, গম, সয়াবিন তেল ও পাম তেল। তবে চিনির দাম মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন গত বৃহস্পতিবার এসব পণ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছে। তুলনার জন্য ভিত্তি ধরা হয়েছে ১৯ জানুয়ারিকে।
চাল: ২০১০ সালের ১৯ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে উন্নত মানের চালের (আন্তর্জাতিক বাজারে লং গ্রেইন নামে পরিচিত) দাম ছিল প্রতি টন ৩৭৭ দশমিক ৯৪ ডলার। বছরব্যাপী বাড়া-কমার মধ্যে থাকলেও এক মাস আগে তা ৪৩২ ডলার পর্যন্ত দর ওঠে। সপ্তাহ খানেক আগে কিছুটা কমে নেমে আসে ৪২৬ ডলারে। তবে গত বুধবার এক লাফে নেমে আসে ৪১২ দশমিক ৫৮ ডলারে। সে হিসাবে বুধবার পর্যন্ত বিশ্ববাজারে এক বছরে চালের দাম বেড়েছে ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ।
একইভাবে মাঝারি মানের (মিডিয়াম গ্রেইন) চালের দাম এক বছর আগে ছিল টনপ্রতি ৩৬৯ দশমিক ৬৭ ডলার, যা বুধবারে ছিল ৪০৭ ডলার। বৃদ্ধির হার ৯ দশমিক ১৯ শতাংশ। মোটা চালের মানের গুঁড়া (ব্রোকেন) চালের দাম ছিল ২৫৭ দশমিক ৮৬ ডলার, গত বুধবারে যার দাম হয় ২৯১ দশমিক ৯২ ডলার। এক বছরে বৃদ্ধির হার ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
অন্যদিকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, দেশীয় বাজারে উত্তম মানের মিনিকেট বা নাজিরশাইল চালের দাম এক বছর আগের তুলনায় বেড়েছে ২০ শতাংশ। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এক বছর আগে মিনিকেট বিক্রি হতো ৩৬ থেকে ৪৪ টাকা। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৪৬ থেকে ৫০ টাকা কেজি।
মাঝারি মানের পাইজাম চালের দাম এক বছর আগে ছিল ৩২ থেকে ৪০ টাকা। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪২ টাকা। বৃদ্ধির হার ২৪ দশমিক ২৪ শতাংশ। আর স্বর্ণা, লতা বা মোটা চাল এক বছর আগে ছিল ২৬ থেকে ২৮ টাকা। বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৩৭ টাকা। বৃদ্ধির হার ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
গম: প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক বছর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ছিল ২০১ দশমিক ৯১ ডলার। এক মাস আগে তা বেড়ে দাম ওঠে ২৭২ ডলারে। গত বুধবার তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২৯২ দশমিক ৯২ ডলারে। এক বছরে গমের দাম বেড়েছে ৩১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ।
গমের দাম বাড়ায় স্বাভাবিক কারণেই দেশীয় আটার বাজারে তার প্রভাব পড়েছে। টিসিবির হিসাবেই এক বছরে আটার দাম বেড়েছে ৪৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছর আগে যে খোলা আটা বিক্রি হতো ২২ থেকে ২৩ টাকা কেজিতে, বর্তমানে তা বিক্রি হচ্ছে ৩৩-৩৪ টাকা কেজিতে।
ভোজ্যতেল: আন্তর্জাতিক বাজারে গত বুধবার সয়াবিন তেলের দর ছিল এক হাজার ২৭১ দশমিক ৮৩ ডলার। তার আগের দিন ছিল এক হাজার ২৬৮ ডলার এবং এক সপ্তাহ আগে ছিল এক হাজার ২৬৬ ডলার। তবে এক মাস আগে এ দাম এক হাজার ২১৪ ডলার এবং এক বছর আগে ৮৩৮ ডলার ছিল। বছরে দাম বেড়েছে ৩৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
অন্যদিকে দেশের বাজারে এক বছর আগে যে খোলা সয়াবিন তেল ৭৪ থেকে ৭৬ টাকা লিটারে বিক্রি হয়েছিল, বর্তমানে তার দাম ৯৯ থেকে ১০৩ টাকা।
টিসিবির হিসাবে, দেশীয় বাজারে সয়াবিন তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়েই বেড়েছে। বৃদ্ধির হার ৩৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
তবে দেশীয় বাজারে পাম তেলের দাম বাড়ার হার অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে এক বছরে বেড়েছে ২৭ দশমিক ২২ শতাংশ। আর দেশীয় বাজারে বেড়েছে প্রায় ৫২ শতাংশ। এক বছর আগের ৫৯ থেকে ৬১ টাকা লিটার দরে বিক্রি হওয়া পাম তেল বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ৯২ টাকা লিটারে।
চিনি: এক বছর আগে উন্নত মানের অপরিশোধিত চিনির টন ছিল ৬৩৮ ডলার। এক সপ্তাহ আগে তা ৭২২ ডলারে উঠলেও গত বুধবারেই কমে ৬৮৭ ডলারে নেমে এসেছে। এক বছরে অপরিশোধিত চিনির দর বেড়েছে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশ।
একই সময়ে দেশে উন্নত মানের পরিশোধিত চিনির দর বেড়েছে ৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। এক সপ্তাহ ধরেই পরিশোধিত চিনির দর কমছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় তেমন একটা বাড়েনি চিনির দাম। এক বছর আগে বিক্রি হতো ৫৪ থেকে ৫৬ টাকা কেজিতে। বর্তমান বাজারদর ৫৫ থেকে ৫৭ টাকা কেজি।
যোগাযোগ করলে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি এ কে আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে কিছু ব্যবসায়ী দাম বাড়ানোর সুযোগটা নেন। তা ছাড়া খুচরা পর্যায় অনেকটা দায়ী। এর অবশ্য কারণও রয়েছে। খুচরা বাজার তদারকির কোনো ব্যবস্থা নেই।
এফবিসিসিআই সভাপতি মনে করেন, নিত্যপণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিকারক আরও বেশি থাকা উচিত। সরকারের দিক থেকে সুযোগ-সুবিধা দিলেই ব্যবসায়ীরা উৎসাহিত হবেন।
এ কে আজাদ আরও বলেন, দেশীয় বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ার ক্ষেত্রে খুচরা বাজার ভূমিকা পালন করে। সুতরাং খুচরা বাজারকেও সরকারের নজরে আনা উচিত।
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের কথা বলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সঙ্গে মাঝে মাঝে বৈঠক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অথচ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, এসব বৈঠকে ব্যবসায়ীরা তাঁদের বাড়ানো দামেরই বরং স্বীকৃতি নিয়ে নিচ্ছেন। গত দেড় মাসে ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে এ চিত্র দেখা গেছে।
আর চিনির দর যে মোটামুটি স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে, তার পেছনে রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে চিনির ওপর সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহার করে নেওয়া। সম্প্রতি ভোজ্যতেলের ওপর থেকেও শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে।
চালের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে চালকল মালিকদের মজুদের প্রবণতাকেও দায়ী করা হয়। সম্প্রতি মজুদের ওপর সময়সীমা ও মজুদের পরিমাণ বেঁধে দিয়েছে সরকার। তার পরও চালের বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। তবে ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়ী হলেও আরেক অর্থে তাঁরা ভোক্তাও। তাই দ্রব্যমূল্যকে বাগে আনতে টিসিবিকে অধিকতর কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়।
ব্যবসায়ীরা বলেন, জনবলকাঠামো, অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) থেকে অব্যাহতিসহ সংস্থাটিকে শক্তিশালী করার যে নির্দেশ দিয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, তা কেন মানা হচ্ছে না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা দরকার। গত দুই বছরে বারবার টিসিবিকে শক্তিশালী করার জন্য বলা হলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
সাম্প্রতিককালে লক্ষ করা যাচ্ছে, কোনো কোনো পত্রিকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাংলাদেশে যে দাম তা আন্তর্জাতিক মূল্যের চেয়ে অধিক বলে সংবাদ প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সরকারকে বিব্রত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
উত্তরমুছুনএই ধারায় গত ২২ জানুয়ারি প্রথম আলোয় ‘ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে নিত্যপণ্য—বিশ্ববাজারের তুলনায় দেশে অনেক বেশি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন এ সংবাদের প্রতিবাদ জানালে তা ২৩ জানুয়ারি প্রথম আলোয় ‘প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রতিবাদ ও ব্যাখ্যা’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়। কিন্তু তাদের ব্যাখ্যায় যা বলা হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয়।
এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য নিয়ে অর্থনৈতিক বিষয়ে সাংবাদিকতা ও সংবাদ পরিবেশন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের বিশ্লেষণে বিশ্ববাজারের তুলনায় দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কম। উদাহরণস্বরূপ—ভোজ্যতেল (সয়াবিন ও পাম), চিনি, চাল ও গমের দাম পার্শ্ববর্তী সব দেশের তুলনায় বাংলাদেশে কম। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের মূল্য চড়া ও ঊর্ধ্বগামী হওয়া সত্ত্বেও সরকারের, বিশেষ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় বাংলাদেশে এসব পণ্যের মূল্য পার্শ্ববর্তী সব দেশের চেয়ে কম রাখা সম্ভব হয়েছে। জনগণকে সহনীয় মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যা সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
অযথা ভিত্তিহীন ও ভুল তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত এবং সরকার ও ব্যবসায়ীদের হেয় না করা এবং জনগণকে আতঙ্কিত না করার জন্য সব প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানানো হচ্ছে। তথ্য বিবরণী।