শেয়ারবাজারের বর্তমান সূচক ছয় হাজার ৩০০ পয়েন্ট, আর মূল্য অনুপাতে আয় (পিই) ২৩। বাজারের এই অবস্থা খুবই সহনশীল। সবকিছু সত্ত্বেও এই বাজারকে স্থিতিশীল করা সম্ভব।
এ কথা উল্লেখ করে কাল মঙ্গলবার থেকে শেয়ারবাজারে লেনদেন শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। স্থিতিশীলতার স্বার্থে এখন থেকে বাজারকে নিজের গতিতে চলতে দেওয়ার কথাও জানান তিনি। এ সময় অর্থমন্ত্রী অনিয়মের তদন্ত করতে ১৫ দিনের মধ্যে কমিটি গঠনের কথা জানান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) নির্দেশে আরোপ করা সাম্প্রতিক মূল্যসূচকে সার্কিট ব্রেকার প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। আর একক কোম্পানির ক্ষেত্রে বর্তমানে শেয়ারের দামের ওপর যে সার্কিট ব্রেকার রয়েছে, শিগগির তা পরিবর্তন করা হবে।
গতকাল রোববার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে শেয়ারবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এর আগে সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘পদ্মা’ এবং সংবাদ সম্মেলন শুরুর আগ মুহূর্তে সচিবালয়ে বাজার নিয়ে পৃথক দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বাজারসংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এ দুই সভায় যেসব মতামত এসেছে, তার ভিত্তিতেই উল্লিখিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান, এসইসির চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকার, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শফিকুর রহমান পাটোয়ারী, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফায়েকুজ্জামান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সকালের সভায় সবাই খোলামেলা কথা বলেছেন। এতে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—এ দুই ধরনের সুপারিশ এসেছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজার বড় হয়েছে। কিন্তু আইনকানুন বা এসইসির জনবল বদলায়নি। এই মুহূর্তের বাজার নিয়ে মত এসেছে। যে সংকটটা তৈরি হয়েছে, সবাই কিছু কিছু এর অংশীদার। সবাই বাজারকে যেভাবে ব্যবহার করেছে, এর অনেক কিছু দেখার আছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে একটি তদন্ত কমিটি করা হবে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। অন্যদিকে খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডসহ (কেপিসিএল) মোট তিনটি কোম্পানির বিষয়েও তদন্তের কথা তিনি জানান।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বুক বিল্ডিং পদ্ধতি কীভাবে হলো বা অন্যান্য ঘটনা কীভাবে হয়েছে, সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিডিবিএল) মাধ্যমে সব দেখা যাবে। দোষ দেওয়ার চেয়েও এখন বেশি দরকার হলো কাজগুলো কীভাবে হয়েছে, তা খুঁজে বের করা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাজার কালও (সোমবার) বন্ধ থাকবে। তবে যেদিন খোলা হবে, সেদিন থেকেই কিছু আইনকানুন চালু করতে চাই। উদ্দেশ্য হলো, বাজারে আস্থা তৈরি করা।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সেদিন পাঁচ মিনিটের মাথায় যখন বাজার বন্ধ হয়ে গেল, তখন সূচক দাঁড়াল ছয় হাজার ৩০০ পয়েন্ট। আর বাজারের মূল্য অনুপাতে আয় (পিই) দাঁড়াল ২৩। এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং যে উন্মত্ত ব্যবহার দেখা গেছে, বাজারের সঙ্গে তা মেলানো যায় না। প্রশ্ন উঠেছে, আমাদের সমন্বয়টা তত ভালো নয়। তবে সমন্বয় ভালো করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, এসইসিতে বর্তমানে যে পরামর্শক কমিটি রয়েছে, এখন থেকে সেই কমিটিকে ঘন ঘন বসতে হবে। কমিটিকে নতুন করে সাজানো হবে, যাতে তারা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রাইভেট প্লেসমেন্টের শেয়ার বরাদ্দসংক্রান্ত এত দিন কোনো বিধিমালা ছিল না। আর বুক বিল্ডিং পদ্ধতিটিও বড় আশা করে প্রণয়ন করা হয়েছিল। এটি স্থগিত করা হয়েছে। আর এই পদ্ধতিতে বাজারে আসার প্রক্রিয়াধীন দুই কোম্পানি মবিল-যমুনা লুব্রিকেন্ট ও এমআই সিমেন্টের লেনদেন হবে না বলে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এই দুটি বন্ধ রাখছি।’
তবে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিটি ভালো বলে স্বীকার করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এই পদ্ধতিতে কোম্পানির পিই দেখাটা দরকার ছিল আগে। তার পরিবর্তে বাজারের দিকে বেশি নজর দেওয়া হয়েছে।
আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘দু-এক দিনের মধ্যে একক কোম্পানির সার্কিট ব্রেকার পরিবর্তন করা হবে। তবে মূল্যসূচকের ব্রেকার আর থাকবে না। কারণ, এটি করতে গেলে যে সফটওয়্যার দরকার, আমরা এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছিনি।’
বাজার ভালো রাখার স্বার্থে কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে কোম্পানি আইনে প্রাইভেট পলিসি রয়েছে। অনেক দেশই তাদের কোম্পানি আইনকে ঢেলে সাজিয়ে ফেলেছে। কিন্তু আমরা এখনো পারিনি। তবে আমাদেরও উদ্যোগ রয়েছে।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের কাছে মার্চেন্টস ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন অনেক বিষয় তুলে ধরেছে। বলেছে যে, তাদের সম্পদের স্বল্পতা রয়েছে। সংস্কার লাগবে এবং তাদের কোথায় কী লাগবে, তা-ও বিবেচনা করা হবে। আর এটা খুব একটা বাজে কথা যে, বাজার থেকে টাকা চলে গেছে। এটা খামাখা কথা। তবে সামান্য টাকা যেতে পারে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংক, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভালোই লাভ করেছে। লাভের টাকা যাতে বাজারে থাকে, সে ব্যাপারে তাদের দায়িত্বশীল হওয়া দরকার।
এসইসির কাজ বেড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সংস্থাটির জনবল বাড়ানোর যে বিষয়টি ছিল, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। এ ছাড়া ঠিক করা হবে এসইসির পর্ষদ। সমন্বয়ের কাজটি ভালোভাবে করার জন্য এসইসির পর্ষদে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন প্রতিনিধি বাধ্যতামূলক করা হবে।
তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য সব সময়ই সতর্কবার্তা রয়েছে অর্থমন্ত্রীর। তিনি বলেন, ‘সবকিছুর পরও বিনিয়োগকারীদের সাবধান থাকতে হবে। অনেক বিনিয়োগকারী বোধহয় জানেনই না যে, তাঁরা কয় টাকার শেয়ার কিনছেন। তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া সবারই কর্তব্য।’
বাজার কি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘শেয়ারবাজার সব সময়ই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ২৩ পিই অনেক সহনীয়।’
কারসাজির দায়ে অভিযুক্ত ছয় ব্রোকারেজ হাউসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ধারণার ওপর ভিত্তি করে এদের কারসাজির কথা বলা হচ্ছে। তবে এদের বিষয়ে আরও খতিয়ে দেখা হবে।’
’৯৬ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারির মামলার হাল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী জানান, ‘এর কোনো সুরাহা করা যায়নি। কারণ, সাক্ষী নেই।’ ভবিষ্যতের কেলেঙ্কারিতেও যদি সাক্ষী না থাকে—প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘না, তখন সাক্ষী না থাকলেও কিন্তু সিডিবিএল রয়েছে।’
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কোনো প্রণোদনা থাকবে কি না—এ প্রশ্নের জবাব দেননি এসইসির চেয়ারম্যান জিয়াউল হক খোন্দকার। তবে তিনি শুধু এইটুকু জানান, ‘গত বছর সূচকের যে ঊর্ধ্বগতি হয়েছে, বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল প্রথম। আর দ্বিতীয় ছিল আর্জেন্টিনা।’ গ্রাহকের ঋণসীমা বিষয়ে শিগগির একটি ডিরেক্টিভ দেওয়ার কথা জানান এসইসির চেয়ারম্যান।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন