শেয়ারের ফাটকা খেলায় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ আইনি সীমায় নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংককে অনেক আগেই দৃঢ়তা দেখানো উচিত ছিল বলে মত প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ।
সাবেক গভর্নর বলেন, ২০০৮ সালের শেষভাগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ নির্ধারিত সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তা সব ধরনের চাপ উপেক্ষা করে বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে তারা কেবল হুঁশিয়ারি দিয়ে গেছে।
সংবাদমাধ্যমে কর্মরত অর্থনৈতিক প্রতিবেদকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত মুদ্রানীতিবিষয়ক এক আলোচনায় অংশ নিয়ে গতকাল রোববার সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ এসব কথা বলেন।
রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ইআরএফের সভাপতি মনোয়ার হোসেন আলোচনা অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আবু কাওসার।
ডিএসইর প্রভাবে ২০০৯ সালের মধ্যভাগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগ ভেস্তে যায়—এ তথ্য উল্লেখ করে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, সেটা কি বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনের দুর্বলতা, না প্রয়োগের। এর জবাবে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মুদ্রানীতির বাস্তবায়ন একটি কুশলতার কাজ। বিচারবুদ্ধি দিয়ে এটা করতে হয়। আবার কতগুলো জায়গায় কঠোরতা দেখাতে হয়।
সাবেক গভর্নর বলেন, ‘একজন গেল আর পরিবর্তন হয়ে গেল, এটা ঠিক নয়। যেমন এসইসিতে হয়েছে। আমার সময়ও একটি ব্যাংক অধিগ্রহণের বিষয়ে অনেক চাপ এসেছিল। আবার ১/১১-এর পরও অনেক চাপ ছিল। কিন্তু সেটা আমরা কাটিয়ে উঠেছি। ফলে কঠোর হতেই হবে, না হলে আর্থিক খাত কিন্তু ধ্বংস হয়ে যাবে।’
সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মূল্যস্ফীতি থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে কর্মসংস্থান না হলে ক্ষতি হয়। এখন নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে না। মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে। তিনি আরও বলেন, মুদ্রা সরবরাহ কমালেই যে মুদ্রানীতি সংকোচনমূলক হবে, এটা ঠিক নয়। আর মুদ্রা সরবরাহ কমানোর আগে দেখা দরকার, আসলে কোন খাতে কত অর্থ যাচ্ছে।
সালেহউদ্দিন বলেন, ‘কাকতালীয়ভাবে সিআরআর বাড়ানো, বিনিয়োগকে আইনি সীমার মধ্যে নামিয়ে আনা এবং ব্যাংকগুলোর বার্ষিক স্থিতি তৈরির সময়কাল খুব কাছাকাছি হওয়ায় সমস্যা হয়েছে। বিধিবদ্ধ জমা মার্চ-এপ্রিল বা ডিসেম্বরের কয়েক মাস আগে করলে এটা হতো না।
সাবেক গভর্নর বলেন, ‘তবে আমানতকারীর টাকা ঝুঁকিপূর্ণ বাজারে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। এতে লাভ হলে উদ্যোক্তা ও শেয়ারধারীরা তার সুবিধাভোগী হন। কিন্তু লোকসানের দায় যায় আমানতকারীর ঘাড়ে।’
ব্যাসেল-৩ আগামী ২০১৮ সালে আসবে, কিন্তু এখন থেকে বাংলাদেশে তার শর্ত অর্থাৎ তদারকি ও নজরদারি এবং তার ভিত্তিতে শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরামর্শ দেন সালেহউদ্দিন আহমেদ।
পুঁজিবাজার নিয়ে সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘নতুন শেয়ার আসছে না, কিন্তু সারা দেশে ব্রোকারেজ হাউস খুলতে দেওয়া হচ্ছে। ফলে এরা তো ব্যবসা করতে চাইবেই। আবার আইপিও এলেও তা হচ্ছে অতিমূল্যায়িত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিহিত মূল্যের চেয়ে ১০-১৫ শতাংশ বেশি প্রিমিয়াম দেওয়া হয়, কিন্তু আমাদের দেশে অনেক গুণ বেশি প্রিমিয়াম দেওয়া হয়েছে।’
সালেহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, পুঁজিবাজারের মধ্যে বন্ড বাজারও থাকতে হবে। কিন্তু দেশে এর উন্নয়ন হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত এটির উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও এসইসির মধ্যে জীবন্ত যোগাযোগ স্থাপনের পরামর্শ দেন।
সালেহউদ্দিন আহমেদ শেয়ারবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে শঙ্কা প্রকাশ করে আরও বলেন, ‘আমি তো ভয় পাচ্ছি, শুধু পুঁজিবাজার নয়, আর্থিক খাতে কোনো সমস্যা যাতে ছড়িয়ে না পড়ে। তাহলে প্রকৃত খাতে বিপর্যয় দেখা যাবে। ফলে সময় এসেছে, কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’
সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, মূলত মূল্যস্ফীতি সামনে রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মুদ্রানীতি করে থাকে। এর লক্ষ্যগুলো খুবই সীমিত। পুঁজিবাজার পরিস্থিতি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গভর্নর তো বটেই, নিচের দিক থেকেও সব সময় বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
ইব্রাহিম খালেদ আরও বলেন, সিআরআরের কারণে মাত্র দুই হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ঢুকেছে। বিপরীতে রেপোতে সাত হাজার কোটি টাকা বাজারে এসেছে। অথচ শেয়ার নিয়ে যাঁরা খেলেন, তাঁরা ধরে নিলেন, এর কারণে পুঁজিবাজারে তারল্য-সংকট হয়েছে। এটা একেবারেই সঠিক নয়।
ইব্রাহিম খালেদ বলেন, মাত্র পাঁচটি ব্যাংক বাজারে ‘ফাউল প্লে’ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সাবধান করলেও অ্যাকশন নিতে পারেনি।
পিকেএসএফের চেয়ারম্যান কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে হবে না, মূল্যস্ফীতিকে আটকাতে হলে তাকে সহায়তা দিতে হবে নানাভাবে। খাদ্য মজুদ ১২ লাখ টনের ওপরে থাকতে হবে। টিসিবিকে কোম্পানি করতে হবে ও আর্থিকভাবে সচ্ছল করতে হবে।
ডিএসইর সাবেক সহসভাপতি আহমেদ রশীদ লালীর এক প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সারা বিশ্বে শেয়ারে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমার হিসাব করা হয় বাজারদরে। এর কিছু কার্যকারণ দিকও আছে। তিনি আরও বলেন, মুদ্রাবাজারে কোনো তারল্য-সংকট নেই। ৩০ ডিসেম্বর ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা ছিল। দু-একটা ব্যাংকের সম্পদ ও দায় ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি আছে মাত্র। তিনি আরও বলেন, ২০০৯ সালের প্রথম ভাগে এসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসইসির সঙ্গে এক বৈঠকে বাজার যে অতিমূল্যায়িত, সে বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। এ সময় বিশ্লেষণ করে তথ্য ও তথ্যচিত্র তুলে ধরা হয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন